শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্পেন ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। এর মধ্যে শুধু স্পেন-এ প্রাণ হারিয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। একই সময়ে জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস-এ জুন মাসের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বড় বড় গণজমায়েত, কনসার্ট ও জনসমাগমমূলক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে বার্সেলোনা-এর নিকটবর্তী দাবানলের কারণে হাজার হাজার মানুষ ঘরের ভেতর অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন।
ফ্রান্স-এ তীব্র গরমে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় প্যারিস-এর সব হাসপাতালে জরুরি পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে। তপ্ত গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি দাবদাহ শুরু হওয়ার পর অনিরাপদ এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে ডুবে অন্তত ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্স সীমান্তবর্তী জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারব্রুকেন-এ সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা এ অঞ্চলের জন্য নজিরবিহীন।
তবে টানা তিন দিন অস্বাভাবিক গরমের পর বর্তমানে ফ্রান্সে তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, হাসপাতালে রোগীর চাপের তুলনায় বাড়িতে আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা **বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা> (ডব্লিউএমও)-এর মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস সতর্ক করে বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই চরম পরিস্থিতির সঙ্গে এখন আমাদের মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের এই ভয়াবহ দাবদাহ ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে ওলন্দাজ সীমান্তসংলগ্ন ক্লাইন ব্রোগেল এলাকায় বেলজিয়ামের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করেছে।
একই সঙ্গে লিমবার্গ, নেদারল্যান্ডসে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সাফোক-এর ক্যাভেন্ডিশ এলাকায় ৩৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে।
শুক্রবার পুরো ইউরোপজুড়ে অন্তত ১৫ কোটি মানুষকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এই তাপপ্রবাহ আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবহাওয়াবিদরা। চেক প্রজাতন্ত্র-এর আবহাওয়াবিদদের ধারণা, ২০১২ সালের ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে অস্ট্রিয়া, যেখানে নতুন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বলকান অঞ্চল-এর দেশগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সার্বিয়া-তে সপ্তাহান্তে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও। সুইজারল্যান্ড-এর বেজনউ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এর দুটি রিয়্যাক্টর শুক্রবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ নিকটবর্তী নদীর পানির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাওয়ায় তা রিয়্যাক্টর শীতল করার জন্য উপযোগী ছিল না।
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন জানিয়েছে, একটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে।
অন্যদিকে কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ইউরোপ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে।
দাবদাহের কারণে ইউরোস্টার-এর একটি ট্রেন কোলন থেকে প্যারিস যাওয়ার পথে ব্রাসেলস-এর কাছে প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়া তিন যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
ফ্রান্সে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের চাপে সপ্তাহ শেষে অনুষ্ঠেয় প্যারিস প্রাইড মার্চ, মিউজিক ফেস্টিভালসহ বেশ কয়েকটি বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। একই কারণে জার্মানিতেও ম্যারাথনসহ বহু আয়োজন স্থগিত করা হয়েছে।
তবে জার্মানির শার্লেটি স্টেডিয়াম-এ অনুষ্ঠিতব্য ডায়মন্ড লিগ অ্যাথলেটিকস মিট বাতিল না করে বিকেলে তাপমাত্রা কমলে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে সোমবার থেকেই দেশটির হিমবাহ দ্রুত গলতে শুরু করতে পারে— যা সাধারণত আগস্ট মাসে দেখা যায়। ২০২২ সালের পর এবারই হিমবাহ গলার গতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।