শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আবহে বিশ্ব যখন নতুন সংঘাত ও অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে, ঠিক তখনই নেপথ্যে থেকে বড় এক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে চীন। কোনো সামরিক সংঘাতে জড়ানো ছাড়াই, এমনকি সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে অংশ না নিয়েও বেইজিং যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করেছে, তা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা চীনের এই ‘নীরব বিজয়’-এরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোর ঘিরে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এর মধ্যকার সাম্প্রতিক সমঝোতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করার পথ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছরের সংঘাতের কারণে এই রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, সৃষ্টি হয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের জন্য এটি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয় ছিল। আর সেই কারণেই বেইজিং শুরু থেকেই সামরিক শক্তির বদলে কৌশলগত বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
গত এক দশকে চীন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর মাধ্যমে বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং লজিস্টিক করিডোরে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইরান—দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সমান কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছে।
যখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক কৌশল ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যস্ত ছিল, তখন চীন নিঃশব্দে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে এমন এক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা এখন তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় সুবিধা বয়ে আনছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সমঝোতার পর যে বিশাল পুনর্গঠন তহবিল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে চীন। কারণ, হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহন খরচ ও বীমা ব্যয় কমবে, যা এশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কেবল যুদ্ধ জয়ের মধ্যেই শক্তির প্রমাণ নিহিত নেই। অর্থনৈতিক সংযোগ, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক পরিকল্পনাও একটি রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে। আর এই বাস্তবতাই নতুন করে তুলে ধরেছে চীনের বর্তমান অবস্থান।
যদিও এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, তবুও এটি স্পষ্ট যে চীন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি হয়তো যুদ্ধের অবসানকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে চীন যেভাবে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছে, তা ভবিষ্যৎ বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের অবস্থানকে আরও প্রভাবশালী করে তুলবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুদ্ধের গোলাবারুদ ব্যবহার না করেও কেবল অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কূটনীতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে চীন দেখিয়ে দিল—আধুনিক বিশ্বে ‘নীরব কৌশল’ অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের চেয়েও বড় বিজয় এনে দিতে পারে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস