শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সংরক্ষণ ও বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা এবং ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেকসহ বিভিন্ন প্রজাতির মোট ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা প্রাণীর মধ্যে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা ছাড়াও কর্ন স্নেক, ডামফি ফ্রগ, লেপার্ড গেকো এবং সাইডনেক কচ্ছপসহ নানা প্রজাতির প্রাণী ছিল। এসব প্রাণী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দেশে আনা, সংরক্ষণ ও বাণিজ্য আইনত নিষিদ্ধ।
তবে প্রশ্ন উঠছে—নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব বিদেশি প্রাণী বাংলাদেশে ঢুকছে এবং কীভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে?
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের তোয়াক্কা না করেই একটি চক্র এসব প্রাণী বিদেশ থেকে দেশে আনছে। এতে দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন, “বিষাক্ত ট্যারান্টুলা, মাকড়সা কিংবা ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক—এসব এখন অনেকেই শখের বশে পুষছেন। এমনকি আফ্রিকার ব্যাঙও লালনপালন করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, বৈধ অনুমতির আড়ালে অবৈধ প্রাণী দেশে আনার সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু চক্র। পাশাপাশি বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে এসব প্রাণী প্রতিবেশী দেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
আদনান আজাদের মতে, বিমানবন্দরে স্বর্ণ বা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকলেও পোষা প্রাণী আনার ক্ষেত্রে নজরদারিতে ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে অবৈধ বাণিজ্য সহজ হয়ে পড়ছে।
তবে বাংলাদেশ বন বিভাগ জানিয়েছে, বিমানবন্দর ও দেশের অভ্যন্তরে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে। বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী উদ্ধারে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানানো হয়।
বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক আব্দুল্লাহ-আস-সাদিক বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী অবৈধভাবে আমদানি, রপ্তানি, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ। কয়েকদিন আগেই মিরপুরে অভিযান চালিয়ে ৮ প্রজাতির ৪২টি দেশীয় বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
রূপনগরের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে অ্যাকুরিয়াম তৈরি করে এসব প্রাণী সংরক্ষণ ও বিক্রি করা হচ্ছিল। অভিযানে ১ হাজার ১০৪টি প্রাণী উদ্ধার হলেও সেখানে প্রায় ৬ হাজার প্রাণী ছিল বলে জানা গেছে। অভিযানের আগেই প্রায় ৫ হাজার প্রাণী বিক্রি হয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রাণী আনার পেছনে দুইটি বড় কারণ রয়েছে—শৌখিন পোষাপ্রাণী হিসেবে চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক পাচার চক্র। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে এসব প্রাণী প্রতিবেশী দেশে পাচার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বিদেশি প্রাণী আনার ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। ফলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “অবৈধ বাণিজ্য বিশ্বজুড়েই রয়েছে, তবে এতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।”
আইন অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ভঙ্গ করে বিদেশি প্রাণী আমদানি, বিক্রি বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন নয়, বিমানবন্দরে নজরদারি জোরদার এবং বিশেষায়িত ওয়াইল্ডলাইফ কন্ট্রোল ইউনিট গঠন না করলে এই অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।