বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     29-06-2026    94
বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২৯ জুন) সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার সহকারী রুবেল মিয়া। তিনি জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোন করে মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুসংবাদ জানায়।

গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে নেওয়া হয়। কয়েকদিন আগে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেওয়ায় আশার সঞ্চার হলেও পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবারও ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়।

এর আগে তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়নি।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা-র নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক বাড়ি শৈলকূপা উপজেলা-র মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা-র সন্তান। দীর্ঘ কর্মজীবনে চিত্রকলা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ, টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখে তিনি দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

মুস্তাফা মনোয়ার মূলত জলরঙে ছবি আঁকতেন। কলকাতা আর্ট কলেজ-এ পড়ার সময় তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একবার তার আঁকা ছবি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “তার আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে।”

শিল্পকলার পাশাপাশি সংগীত ও নাট্যচর্চাতেও ছিল তার সমান আগ্রহ। একসময় কলকাতার বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করেছেন। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে গান শেখেন এবং শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী-র দলে প্রায় তিন বছর গান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুন-এর উদ্যোগে গঠিত সাংস্কৃতিক দলে যোগ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন-এর সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। সে সময় ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কার্টুন এঁকে এক মাস কারাবরণও করেন। এই অভিজ্ঞতাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা তৈরি করে।

আর্ট কলেজে পড়াশোনা শেষে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর অনুরোধে ১৯৬০ সালে ঢাকায় এসে চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্র-এ যোগ দিতে চারুকলার চাকরি ছেড়ে দেন। পাকিস্তান আমলে বাংলা সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার প্রবণতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই তিনি টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তান দিবসে টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শনের বিরোধিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের পরে শেষ করে পাকিস্তানের পতাকা দেখানোর বিষয়টি প্রতীকীভাবে প্রতিহত করেছিলেন।

বাংলাদেশে অ্যানিমেশন ও পাপেট শো জনপ্রিয় করার পেছনে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র পারুল পরবর্তীতে ইউনিসেফের সহায়তায় বিখ্যাত মীনা চরিত্র তৈরিতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

টেলিভিশনে তিনি রক্তকরবী, মুখরা রমণী বশীকরণ-এর মতো নাটক নির্মাণ করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ি-রও রূপকার ছিলেন তিনি।

মুস্তাফা মনোয়ার-এর মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। দেশ পত্রিকা’সহ সকল সহকর্মী, অনুরাগী ও শুভানুধ্যায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছেন।

জাতীয়-এর আরও খবর