সংসদে বেফাঁস কথার প্রতিযোগিতা, হারাচ্ছে মর্যাদা ও নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     22-06-2026    94
সংসদে বেফাঁস কথার প্রতিযোগিতা, হারাচ্ছে মর্যাদা ও নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়

দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জাতীয় সংসদ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখানে আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং জনগুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে আলোচনা করেন। সংসদের প্রতিটি অধিবেশন পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তব্য দিতে হয় সংসদ সদস্যদের। এজন্য কার্যপ্রণালী বিধিসহ নানা নিয়ম-কানুনও মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন সময়ের মতো চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও একাধিক সংসদ সদস্যের বেফাঁস, অপ্রাসঙ্গিক এবং বিতর্কিত বক্তব্য নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি ও বিরোধী— দুই পক্ষের কিছু সদস্যের বক্তব্য দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে, সংসদে যেন বেফাঁস কথার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর ফলে যেমন সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি অপচয় হচ্ছে জনগণের অর্থ ও মূল্যবান সময়।

বিশ্লেষকদের মতে, এবার সংসদে অনেক নতুন সদস্য এসেছেন এবং তুলনামূলকভাবে খোলামেলা পরিবেশ থাকায় কেউ কেউ আবেগ বা প্রস্তুতির অভাবে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য দিয়ে ফেলছেন। যদিও অনেকেই বলছেন, আগের তুলনায় বর্তমান সংসদ অনেক বেশি প্রাণবন্ত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংসদের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং জনগণের প্রত্যাশার জায়গাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নতুন সংসদ, নতুন প্রত্যাশা সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরে জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে ঘিরে তাই মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি।

গত ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, তিনি জাতীয় সংসদকে জাতীয় সমস্যা সমাধান ও যুক্তিতর্কের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেছিলেন, নতুন সংসদ একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও গণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহননের বদলে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রথম অধিবেশন তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক পরিবেশে শেষ হলেও ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশনে এসে পরিস্থিতি মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। বিভিন্ন এমপির বক্তব্য ঘিরে শুরু হয় বিতর্কের পর বিতর্ক। অথচ তথ্য অনুযায়ী সংসদের প্রতি মিনিট পরিচালনায় ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জাতীয় সংসদে সদস্যদের নিম্নমানের বা বেফাঁস বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তার মতে, সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র। সেখানে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করলে শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদাই নয়, পুরো সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন ও কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, অনেক সংসদ সদস্য আইন প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণের চেয়ে স্থানীয় উন্নয়ন রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন, যা সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য ১৮ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারদলীয় সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক সংসদের বাইরের ধর্মীয় নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্য করেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিতর্ক তৈরি করলে স্পিকার বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেও স্বীকার করেন, সংসদের বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়ায় এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়। এমনকি নিজের মন্তব্যও পরে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

আরেক ঘটনায় জামায়াতের এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট বক্তব্যে ভুল করে নিজের জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে তিনি এটিকে ‘মুখ ফসকে বলা’ বলে ব্যাখ্যা দেন।

স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা সংসদকে ‘ঋণ খেলাপিদের সংসদ’ বলে উল্লেখ করলে সরকারি ও বিরোধী সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। পরে বক্তব্যটি বাদ দেওয়ার দাবিও ওঠে।

ওয়াশিং মেশিন থেকে চেয়ার বিতর্ক চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন এবং পর্দা দেওয়ার দাবি জানান। এরপর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

পরদিন সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ বিষয়টি নিয়ে কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য করলে সংসদে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক সংসদ কক্ষের চেয়ার নিয়ে অভিযোগ তুলে বলেন, চেয়ারের পেছনের অংশ ঠিক না থাকায় সদস্যদের হাত কেটে যাচ্ছে। এ নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

পোশাক, ভাষা ও চানাচুর বিতর্ক জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের পোশাক নিয়ে সরকারদলীয় এমপি মনিরুল হক চৌধুরী মন্তব্য করলে সংসদে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধী সদস্যরা এটিকে আপত্তিকর ও অসম্মানজনক আখ্যা দেন। পরে বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়।

বিএনপির নারী সংসদ সদস্য জিবা আমিন খান বাজেট আলোচনায় বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে ব্যাকরণগত ভুলে ভরা বক্তব্য দিলে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাস্যরসের জন্ম দেয়।

এদিকে গাইবান্ধা-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন বাজেটের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে ‘চানাচুরের পুষ্টিগুণ’ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেন। সেটিও পরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

একইভাবে জামায়াতের এমপি মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার বাজেট আলোচনায় একটি উপমা ব্যবহার করলে সেটিকে ‘অরুচিকর’ উল্লেখ করে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার।

সংসদকে সংযত রাখার আহ্বান বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের মাধ্যমে সংসদে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় সিনিয়র সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান মনে করেন, অনেক সদস্য এবার প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। ফলে অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কথা চলে আসে।

প্রশ্ন উঠছে সংসদের মর্যাদা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। সেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন ভাষা, অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক কিংবা হাস্যরসের খোরাক তৈরি হয়— এমন বক্তব্য সংসদের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতেও স্পষ্টভাবে বলা আছে— বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না, আক্রমণাত্মক বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না এবং বক্তব্য হতে হবে প্রাসঙ্গিক ও শালীন।

প্রশ্ন এখন একটাই— জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্র হয়ে ওঠা নতুন সংসদ কি সত্যিই গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা হবে, নাকি বেফাঁস কথার প্রতিযোগিতায় হারাবে নিজের মর্যাদা?

জাতীয়-এর আরও খবর