শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
পাবনার সাঁথিয়ায় গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি সমর্থকদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে বর্বরোচিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২২ মে) রাতে উপজেলার নাগডেমড়া ইউনিয়নের পাথাইল হাট এলাকায় এই সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান ও জামায়াত নেতাকর্মীদের দায়ী করলেও, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এমপি।
বিরোধের নেপথ্যে পূর্বশত্রুতা ও ঈদগাহর নিয়ন্ত্রণ:
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই পাথাইল হাট এলাকায় জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে চরম বিরোধ চলছিল। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে বিএনপি সমর্থকদের দোকান ভাঙচুর এবং ক্ষেত থেকে জোরপূর্বক পেঁয়াজ লুটের অভিযোগে জামায়াত সমর্থকদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলার আসামিরা সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগী রাসেল ও তার পরিবারকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছিল।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় ছোট পাথাইল ঈদগাহ মাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং প্যান্ডেল সাজানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব বাধে। জামায়াত সমর্থকরা এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং ঈদের নামাজ নিয়ে হুমকি দেয়। পাথাইল গ্রামের নাসিমা বেগম বলেন: আমার ভাসুর ও ছেলেরা বলেছিল, মরলেও এক জায়গাতেই কবর হবে, তাহলে নামাজ আলাদা হবে কেন? সবাই মিলেমিশে পড়ব। এই নিয়ে কথা-কাটাকাটির পর সবাই বাড়ি চলে যায়। কিন্তু পরে তারা মাইকিং করে এই তাণ্ডব চালায়।
মুয়াজ্জিনকে জিম্মি করে মাইকিং ও তাণ্ডব:
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিরোধ চরমে পৌঁছালে স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোকছেদ প্রামাণিককে জিম্মি করে মাইক ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মুয়াজ্জিন জানান, নজরুল নামের এক ব্যক্তি তার সামনেই মাইকে ঘোষণা দেয়, সবাই লাঠি-ফালা নিয়ে বাইর হ’। এরপরই একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়ে দাঙ্গা বাধায়।
গ্রামের বাসিন্দা আসাদুরের ভাষ্যমতে, উত্তেজিত হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রফিক ও শফিক নামের দুই ভাইয়ের বাড়িঘর এবং রাসেল নামের এক ব্যবসায়ীর দোকানে একযোগে হামলা চালায়।
১৫ লাখ টাকার ক্ষতি ও ধর্ষণের হুমকি:
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. রাসেল জানান, তার খৈল, ভুষি, সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি বিকাশের ব্যবসাও রয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় হযরত মাস্টারের নেতৃত্বে একদল লোক দোকানে ভাঙচুর চালায়। এরপর তারা বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানকে মারধর করে। দোকান থেকে বিকাশের নগদ ২ লাখ টাকা, দুধ ও মূল্যবান কীটনাশক লুট করে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে তার প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়াও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মর্জিনা খাতুন অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা কেবল ভাঙচুর ও লুটপাটই করেনি, বরং গ্রামের নারীদের শ্লীলতাহানি করে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। ইউনিয়ন যুবদলের ২ নং ওয়ার্ডের সেক্রেটারি সরোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, এর আগেও জামায়াতের হযরত মাস্টার, নজরুল, কালু ও ইউনুসদের নেতৃত্বে তাঁর ১১ বিঘা জমির পেঁয়াজ জোরপূর্বক লুটে নেওয়া হয়েছিল।
৪ জন গ্রেফতার, এলাকায় তীব্র ক্ষোভ:
সহিংসতার ঘটনায় শুক্রবার রাতেই ভুক্তভোগী রাসেল বাদী হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে সাঁথিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি হযরত আলী মাস্টার, শাকিল, রবিউল ইসলাম কালু ও মেহেদী হাসান জুয়েলসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে শনিবার (২৩ মে) দুপুরে লুণ্ঠিত দোকানপাটের সামনে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জনতা বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
যা বলছেন এমপি ও পুলিশ:
অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মন্তব্য করেন: ঝামেলার বিষয়টি আমি সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনেছি। এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনাকে দলীয় রঙ দেওয়া ঠিক নয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিচার হওয়া উচিত। আমরা কোনো দলীয় প্রভাব খাটাই না এবং অভিযুক্তরা আমাদের কেউ না।
সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকেই চারজনকে আটক করা হয়েছে এবং পরে এই বিষয়ে একটি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।