ঢাকা থেকে সান্তা মার্তা: জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ধরিত্রীর দাবিতে বিশ্বজনতার গর্জন

  নিজস্ব প্রতিবেদক | দেশ পত্রিকা     01-05-2026    170
ঢাকা থেকে সান্তা মার্তা: জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ধরিত্রীর দাবিতে বিশ্বজনতার গর্জন

জীবাশ্ম জ্বালানির অভিশাপমুক্ত একটি টেকসই পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকারে মুখরিত হলো কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা শহর। কলম্বিয়া ও নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ উদ্যোগে এবং বিশ্বজুড়ে জলবায়ু কর্মীদের অংশগ্রহণে সম্প্রতি সেখানে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত সম্মেলন। একই সময়ে আয়োজিত ‘পিপলস সামিট’ থেকে বিশ্বনেতাদের প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে এক শক্তিশালী বার্তা: “জীবাশ্ম জ্বালানি নয়, চাই জলবায়ু ন্যায়বিচার।”

বৈশ্বিক সংহতিতে একীভূত বাংলাদেশ

সান্তা মার্তার এই বৈশ্বিক আহ্বানে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক গণজাগরণ। ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (DHORA) এবং ‘ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’-সহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকা ও দেশের ১০টি কৌশলগত স্থানে মানববন্ধন, র‍্যালি ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা এবং বৈশ্বিক আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সংহতি জোরদার করা।

সান্তা মার্তার রাজপথে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সান্তা মার্তায় আয়োজিত ‘পিপলস মার্চ ফর এ ফসিল ফ্রি ফিউচার’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী ও সংগঠক শরীফ জামিল।

বিশাল পদযাত্রা: বিকেল সাড়ে ৪টায় সেনা কমার্শিয়াল সেন্টার থেকে শুরু হওয়া এই বর্ণাঢ্য মিছিলে অংশ নেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

সমাপনী সমাবেশ: দুই ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ পদযাত্রাটি শহরের ঐতিহাসিক প্লাজা দে বলিভারে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে সংহতি বক্তব্য প্রদান করা হয়।

সংকটের মূলে জীবাশ্ম জ্বালানি: শরীফ জামিলের হুঁশিয়ারি

প্লাজা দে বলিভারের সমাবেশে শরীফ জামিল তার বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

“জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর তথাকথিত উন্নয়নই আজকের বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রধান কারিগর। এর ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। নিরাপদ পানি, খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটি কেবল বাংলাদেশের সংকট নয়। পাকিস্তানের প্রলয়ংকরী বন্যা, নেপালের হিমবাহ গলন কিংবা ফিলিপাইনের বাতাঙ্গাসে এলএনজি অবকাঠামোর বিরূপ প্রভাব—সবই একই সূত্রে গাঁথা।

উন্নয়নের ভ্রান্ত ধারণা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে শরীফ জামিল একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, আয়তনে ছোট এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ সাল নাগাদ কয়লা ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে শীর্ষ ৪টি দেশের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন:

বেলেম, বাকু ও দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত নগণ্য।

প্যারিস চুক্তির অধীনে গৃহীত অধিকাংশ উদ্যোগ এখনও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

আগামীর পথচিত্র: একটি কার্যকর রূপরেখার দাবি

বক্তব্যের শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, উন্নয়ন মানেই জীবাশ্ম জ্বালানি—এই ধারণা থেকে বিশ্বকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি অবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর ‘রোডম্যাপ’ বা রূপরেখা প্রণয়নের দাবি জানান।

সান্তা মার্তার এই সম্মেলন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জলবায়ু ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে বিশ্ব এখন ঐক্যবদ্ধ। আর এই বৈশ্বিক আন্দোলনে বাংলাদেশ কেবল একাত্ম নয়, বরং নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালনে বদ্ধপরিকর।

জাতীয়-এর আরও খবর