আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা: শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তিতে নতুন শঙ্কার মুখে রাজধানী

  বিশেষ প্রতিবেদক | দেশ পত্রিকা    30-04-2026    113
আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা: শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তিতে নতুন শঙ্কার মুখে রাজধানী

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনের প্রকাশ্য ও নাটকীয় হত্যাকাণ্ড ঢাকার অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর রূপকে সামনে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কারাগার থেকে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি এবং তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার চেষ্টায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়েছে।

কারাগারে থেকে মুক্তিতে বাড়ছে আতঙ্ক

৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একে একে কারামুক্ত হয়েছেন ইমন, পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম ও ফ্রিডম রাসুর মতো দাপুটে সন্ত্রাসীরা। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলেও তাদের অপরাধপ্রবণতা কমেনি; বরং মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে তারা আবারও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সুইডেন আসলাম: ২২টি মামলার আসামি এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী কারামুক্ত হওয়ার পর তেজগাঁও, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

পিচ্চি হেলাল: মোহাম্মদপুর এলাকায় তার দাপট এখন প্রকাশ্য। জামিনে মুক্তির পরপরই রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় তাঁর নাম আসায় জনমনে ভীতি বেড়েছে।

কিলার আব্বাস: ভাসানটেক এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কাজে বাধা ও বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে।

আধিপত্যের লড়াই ও টিটন হত্যাকাণ্ড

পুলিশের ধারণা, টিটন হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি অপরাধ সাম্রাজ্যের পুনর্বিন্যাসের ফল। টিটন জেল থেকে বেরিয়ে তাঁর হারানো রাজত্ব উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন, যা কিলার বাদল বা পিচ্চি হেলালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের স্বার্থে আঘাত হানে। এই ক্ষমতার লড়াইয়েরই রক্তাক্ত পরিণতি এই হত্যাকাণ্ড।

পুলিশের চ্যালেঞ্জ ও অভ্যন্তরীণ সংকট

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ বাহিনী এখনও তাদের পূর্ণ মনোবল ফিরে পায়নি। এছাড়া বাহিনীর ভেতরে থাকা একটি স্বার্থান্বেষী মহল বর্তমান সরকারকে বিব্রত করতে অপরাধীদের পরোক্ষ প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। মগবাজার ও মালিবাগ এলাকায় কারারুদ্ধ সুব্রত বাইনের অনুসারীদের নতুন করে সক্রিয় হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাঁদাবাজির নতুন বিস্তার

রাজধানীর আইটি হাব হিসেবে পরিচিত মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুরের আড়ত। সবখানেই এখন নতুন নতুন গ্রুপের দাপট। ব্যবসায়ীদের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে নজিরবিহীন অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে, যার ফলে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ সময় কারাগারে থেকেও সংশোধিত হয়নি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা বেরিয়ে এসে পুরনো নেটওয়ার্ক সচল করছে। কঠোর নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সাবেক পুলিশ প্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার মনে করেন, এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা পুলিশের রয়েছে, তবে এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

উপসংহার:

রাজধানীর অপরাধ জগত এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে পুরনো ডনদের ফিরে আসা, অন্যদিকে নতুন গ্রুপগুলোর শক্তি প্রদর্শন, সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন এই অপরাধচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে।

জাতীয়-এর আরও খবর